অর্থনীতি পুনরুদ্ধারই প্রধান চ্যালেঞ্জ

করোনার ধাক্কায় নড়বড়ে দেশের অর্থনীতি। ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি নেই। নতুন করে ১০ শতাংশের বেশি মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে চলে এসেছে। অর্থনীতির মৌলিক সূচকগুলোর মধ্যে রেমিটেন্স ছাড়া সব নিম্নমুখী। এ অবস্থায় করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের ঝুঁকি নিয়ে শুরু হচ্ছে নতুন বছর। এত কিছুর মধ্যেও আশার আলো হল- যত বেশি খারাপের আশঙ্কা করা হয়েছিল, অর্থনীতি ওই পর্যায়ে যায়নি। ইতোমধ্যে করোনার ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয়েছে। জানুয়ারিতে দেশে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে মানুষের মনোবল বেড়েছে। এছাড়া করোনার ধাক্কা মোকাবেলায় বিভিন্ন খাতে প্রণোদনা প্যাকেজ দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয় দফা এ প্রণোদনা প্যাকেজ তৈরি করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।তবে অর্থনীতিবিদদের বিবেচনায় নতুন বছরে অর্থনীতি ৭টি মৌলিক চ্যালেঞ্জ থাকছে। এগুলো হচ্ছে- রাজস্ব আদায়, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো, টাকার মান স্থিতিশীল ও লেনদেনের ভারসাম্য ধরে রাখা, খাদ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ, করোনায় প্রণোদনার সুষম বণ্টন, সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা এবং সবার জন্য করোনার ভ্যাকসিন নিশ্চিত করাসহ স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাত পুনর্গঠন করা। আর এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারলে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার সম্ভব। এছাড়াও অর্থ পাচার ও দুর্নীতি রোধে কঠোর পদক্ষেপের সুপারিশ করেছেন তারা। যুগান্তরের সঙ্গে দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা এসব কথা বলেন। যারা কথা বলেছেন- এর মধ্যে রয়েছেন- তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম, ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ, পলিসি রিসার্স ইন্সটিটিউট (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর এবং ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর সহ-সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান। একটি বিষয়ে সবাই একমত পোষণ করেছেন- চলমান করোনার প্রভাব অর্থনীতিতে অনেকদিন থাকবে। আর দ্বিতীয় ঢেউ ভয়ংকর আকারে এলে এটি সামাল দেয়া অত্যন্ত কঠিন হবে বলে আশঙ্কা তাদের।জানা গেছে, গত কয়েক বছর পর্যন্ত দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় সংকট ছিল বেসরকারি বিনিয়োগের অভাব। সরকার বিষয়টি স্বীকার করে বিনিয়োগ বাড়াতে বাজেটে এবং আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে বিভিন্ন উদ্যোগের কথা বলেছিল। কিন্তু করোনা এসে সেই সংকটকে মহাসংকটে রূপ দিয়েছে। এছাড়া মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমছে। অর্থাৎ অর্থনীতির দুর্বল অবস্থা নিয়ে শুরু হচ্ছে নতুন বছর।

জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, নতুন বছরে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ সামনে চলে এসেছে। প্রথমত, গত ১০ বছরে দেশে প্রবৃদ্ধির ইতিবাচক একটি ধারা ছিল। বর্তমানে সেই ধারাটি অনেকটা স্তিমিত হয়ে গেছে। ফলে ২০২০ সালে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার অনেকটা কমেছে। সেটিকে পুনরুদ্ধার করা নতুন বছরে বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে ইতোমধ্যে অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা অনুমোদন করা হয়েছে। সেখানে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৮ দশমিক ৫১ শতাংশ। এটি অর্জনের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছিল। করোনার কারণে সেখানে বিপর্যয় হয়েছে। ২০১৯ সালে দেশে ২০ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে ছিল। কিন্তু বিভিন্ন হিসাব বলছে, ২০২০ সালে তা ৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ ১০ শতাংশের বেশি মানুষ নতুন করে দারিদ্র্য সীমার নিচে চলে গেছে। এদের কীভাবে দারিদ্র্য সীমার উপরে নিয়ে আসা যায়, সেটি অন্যতম চ্যালেঞ্জ। তৃতীয়ত, বাংলাদেশের দীর্ঘদিন থেকে আয় বৈষম্য ছিল। করোনার কারণে সেটি আরও বেড়েছে। বিপুলসংখ্যক মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। অনেকে শহর থেকে গ্রামে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের অনেকের উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। চতুর্থ বিষয় হল, করোনা মোকাবেলায় ব্যবসায়ীদের জন্য যেসব প্রণোদনা প্যাকেজ দেয়া হয়েছিল, সেগুলোর সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিত করা যায়নি। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের জন্য যে প্রণোদনা দেয়া হয়েছিল, তার ৪০ শতাংশ বিতরণ হয়েছে। কিন্তু বড় শিল্পের ক্ষেত্রে এ হার বেশি। ফলে সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে যারা যোগ্য, তাদের প্রণোদনার অর্থ বিতরণ করে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়াতে অবদান রাখতে হবে। পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তার যেসব কর্মসূচি আছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে অনেক সময় দুর্নীতির কথা শোনা যায়। ফলে সেসব বিষয়ের দিকে দৃষ্টি হবে। মির্জ্জা আজিজ বলেন, করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের কথা বলা হচ্ছে। অন্যান্য দ্বিতীয় ঢেউ চলছে। কিন্তু বাংলাদেশে সংক্রমণের হার খুব একটা বেশি বাড়েনি। ফলে ভবিষ্যতে কী হবে, সেটি বলা কঠিন। এক্ষেত্রে আক্রান্তের হার অনেক বেশি বাড়লে কঠিন চ্যালেঞ্জে পড়বে বাংলাদেশ।

চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। মূলত আমদানি-রফতানি কার্যক্রম হ্রাস পাওয়ায় সামগ্রিকভাবে রাজস্ব আদায়ে এর প্রভাব পড়েছে। অর্থবছরের প্রথম ৫ মাসে (জুলাই- নভেম্বর) রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল ১ লাখ ১২ হাজার ৯৫৯ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ৮৭ হাজার ৯২ কোটি টাকা। অর্থাৎ ঘাটতি ২৫ হাজার ৮৬৭ কোটি টাকা। শতকরা হিসাবে যা ২৩ শতাংশ। এর মানে বিনিয়োগের জন্য উদ্যোক্তারা টাকা নিতে চান না। এ কারণে ব্যাংকে অসল টাকার পাহাড় জমা হয়ে আছে। আমানতের হার ৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। এছাড়া একমাত্র রেমিটেন্স ছাড়া অর্থনীতির অন্যান্য সূচকেও ঘাটতি রয়েছে ব্যাপক। অর্থবছরে রফতানিতে ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছিল। কিন্তু ৬ মাসে ১৭ শতাংশ ঘাটতি হয়েছে। এছাড়াও করোনার কারণে রফতানি লক্ষ্যমাত্রা ৪৫ বিলিয়ন ডলার থেকে ৩৩ বিলিয়ন ডলারে নামিয়ে আনা হয়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৮ দশমিক ১৯ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ দশমিক ২৪ শতাংশের নামিয়ে আনা হয়েছে। জিডিপির অনুসারে বেসরকারি বিনিয়োগ ২৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ২৩ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে এসেছে। সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) জিডিপির দশমিক ৮৭ শতাংশে কমিয়ে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে দশমিক ৫৪ শতাংশ। অন্যদিকে বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে সাড়ে ৫ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে সাড়ে ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ। আর এগুলোও অর্জন নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, করোনার কারণে ২০২০ সালে অর্থনীতিতে প্রাথমিক অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু তা মোটামুটিভাবে সামাল দেয়া বা সামাল দেয়ার চেষ্টায় করা হচ্ছিল। এক্ষেত্রে দুটি বিষয় হল, সামষ্টিক অর্থনৈতিক ধাক্কা কিছুটা সামাল দেয়া গেছে। যেমন রেমিটেন্স ও রফতানিতে ওইভাবে ধস নামেনি। কিন্তু ব্যক্তি অর্থনীতিতে এখনও এর বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। বিশেষ করে জিডিপির ৫৫ শতাংশ আসে সেবা খাত থেকে। এ সেবা খাত এখনও পুনরুদ্ধার হয়নি। তাদের জন্য কিছু বরাদ্দ দেয়া হলেও তা পৌঁছানো যায়নি। এ অবস্থায় করোনার দ্বিতীয় টেউয়ের আশঙ্কা সামনে এসেছে। এর ফলে অর্থনীতিতে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। নতুন বছরে এটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে থাকবে। বিশেষ করে সামষ্টিক অর্থনীতিকে আরও ঝুঁকিমুক্ত করার চেষ্টা অন্যতম চ্যালেঞ্জ। দ্বিতীয়ত, ব্যক্তি অর্থনীতিতে সেবা খাতের ধস পুনরুদ্ধার অন্যতম চ্যালেঞ্জ। এর মধ্যে রয়েছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান। এক্ষেত্রে সরকারের সরবরাহ চ্যানেলটি অর্থাৎ ব্যাংকিং খাত যথাযথ ছিল না। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যাংকের যোগাযোগ নেই। ফলে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এলেও সরবরাহ চ্যানেলকে গুরুত্ব দিতে হবে। তৃতীয়ত, সহায়তা দেয়ার ক্ষেত্রে গবেষণা ও তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। কোথায় কীভাবে সহায়তা দিতে হবে, তার সঠিক তথ্য সরকারের কাছে নেই। চতুর্থত, মানবসম্পদ উন্নয়ন। এটি অর্থনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। বিশেষ করে ২০২০ সালে আমাদের শিক্ষা খাত অনেক বড় ধাক্কা খেয়েছে। নতুন বছরে এটিকে সামনে আনতে হবে।

তার মতে, বিশ্ব অর্থনীতি খুব দ্রুত আগের অবস্থানে ফিরে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। ফলে গতানুগতিক খাতের মধ্যে না থেকে প্রবৃদ্ধির নতুন চালক আবিষ্কার করতে হবে। এক্ষেত্রে শুধু আবিষ্কারে সীমাবদ্ধ নয়, সঠিক নীতি-সহায়তার মাধ্যমে এগুলো প্রকৃত চালক হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য যুগান্তরকে বলেন, করোনার নেতিবাচক প্রভাব অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন থাকবে। এটি বিবেচনায় রেখেই পরিকল্পনা নিতে হবে। এক্ষেত্রে সবার আগে স্বাস্থ্যসেবা এবং করোনার ভ্যাকসিনে জোর দিতে হবে। তিনি বলেন, নতুন বছরে অর্থনীতিতে চ্যালেঞ্জ মূলত ৪টি। প্রথম চ্যালেঞ্জ সম্পদ সমাবেশ। এর মধ্যে অন্যতম হল কর আহরণ। বর্তমানে কর জিডিপি রেশিও স্থবির হয়ে আছে। সরাসরি কর আদায়ের অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসের ফলাফল উৎসাহব্যঞ্জক না। এক্ষেত্রে করোনার সময়ে অর্থাৎ গত বছরের শেষ ৬ মাসে যা ছিল, বর্তমান পরিস্থিতি তারচেয়েও খারাপ।দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হল, ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ সচল করা। তার মতে, করোনার আগে থেকেই ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ স্থবির অবস্থায় ছিল। আর করোনার সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের সঙ্গে অপ্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর যুব কর্মসংস্থানের বিনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই। সিপিডির এ বিশেষ ফেলো বলেন, ব্যাংকিং খাত দুর্বল। তবে বর্তমানে সেখানে তারল্য আছে। কিন্তু বেসরকারি খাত এখন ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে না। ড. দেবপ্রিয় বলেন, বেসরকারি বিনিয়োগের সঙ্গে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) সম্পৃক্ত। এক্ষেত্রে এফডিআই নিয়ে যে পরিমাণ প্রচার হয়, সে হারে বিনিয়োগ হয় না। তৃতীয়ত, চ্যালেঞ্জ বৈদেশিক লেনদেনের ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষা করা। সাম্প্রতিক সময়ে রফতানি কিছুটা বাড়ছে। কিন্তু পুরোটা ঘুরে দাঁড়াচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। ফলে রফতানি বাড়ানো এবং রেমিটেন্স অব্যাহত রাখা অন্যতম চ্যালেঞ্জ।তিনি বলেন, সাম্প্রতিক রেমিটেন্স ব্যাপকভাবে বাড়ছে। কিন্তু এটি কতটা টেকসই, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। কারণ মানুষ নতুন করে বিদেশে যাচ্ছে না। ফলে টাকা কেন এবং কীভাবে আসছে, তা প্রশ্ন রয়েছে। দেশ থেকে পাচার হওয়া টাকা আবার দেশে আসছে কিনা এ প্রশ্ন রয়েছে। ফলে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য এবং টাকার মান ঠিক রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ। চতুর্থ চ্যালেঞ্জ হল, সাম্প্রতিক সময়ে খাদ্য মূল্যের ঊর্ধ্বগতি নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে চালের দাম বৃদ্ধির মূল্যস্ফীতির ওপর সৃষ্টি করে কিনা সেটি বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ একদিকে অর্থনীতি তেজি নয়, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি বাড়লে দু’দিক থেকে সমস্যা তৈরি করবে। পাশাপাশি শিক্ষায় জোর দিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় এ খাত অনেক পিছিয়ে গেছে।

তিনি বলেন, করোনার কারণে শিখেছি, শুধু প্রথাগত দুস্থ মানুষ নয়, নিম্ন মধ্যবিত্তরাও বিপন্ন বোধ করেন। সেক্ষেত্রে সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষার বিষয়টি ভাবতে হবে। সর্বশেষ বিষয় হল, করোনার টিকায় জোর দিতে হবে। ২০২০ যদি করোনার বছর হয়, তবে ২০২১ সাল হওয়া উচিত টিকার বছর। এক্ষেত্রে টিকা সংগ্রহ, রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যবস্থাপনা এবং বিতরণ সঠিকভাবে করতে হবে। এক্ষেত্রে আমি দৃঢ়ভাবে বলছি, অসুবিধাগ্রস্ত প্রবীণ মানুষদের টিকা বিনামূল্যে দেয়া উচিত।

জানা গেছে, দেশে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির জন্য শিল্পায়নে বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর বিনিয়োগে পুঁজি সংগ্রহের দুটি খাত হল ব্যাংক ও শেয়ারবাজার। কিন্তু দুটি খাতই নাজুক অবস্থায়। এছাড়া একটি দেশে বিনিয়োগ বাড়লে চারটি নির্দেশক দিয়ে বোঝা যায়। প্রথমত, বিডায় নিবন্ধন বাড়বে। দ্বিতীয়ত, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বাড়বে। একইভাবে বাড়বে মূলধনী যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি। বিডার তথ্য অনুসারে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় জুলাই-সেপ্টেম্বরে স্থানীয় বিনিয়োগ ৬১ শতাংশ এবং বিদেশি বিনিয়োগ ৯৩ শতাংশ কমেছে।

এছাড়া চলতি মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছিল ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ। কিন্তু গত বছরের অক্টোবর পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। অন্যদিকে আগের বছরের চেয়ে চলতি অর্থবছরের প্রথম ৩ মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে ৩৯ দশমিক শতাংশ এবং শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমেছে ১৫ দশমিক শতাংশ। আর এ তিন সূচকের সম্মিলিত বার্তা হল দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ হচ্ছে না।

পলিসি রিসার্স ইন্সটিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর যুগান্তরকে বলেন, করোনার কারণে অর্থনীতির অনেক খাতে সমস্যা হয়েছে। ইতোমধ্যে অর্থবছরের প্রথম ৬ মাস শেষ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় সবচেয়ে বড় সমস্যা পড়েছে সরকারের রাজস্ব আদায়। এ রাজস্ব বাড়াতে না পারলে সমস্যা। এরপর করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের কথা শোনা যাচ্ছে। শুরুতে বলা হচ্ছিল এটি মার্চের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। এখনও শোনা যাচ্ছে, করোনা জুন-জুলাই পর্যন্ত যাবে। এর মানে হচ্ছে, এ অর্থবছরে করোনা থেকে বের হওয়া কঠিন। যা অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। ফলে নতুন বছরে করোনার ভ্যাকসিনে নিশ্চিত করার জন্য বেশি জোর দিতে হবে। তিনি বলেন, সামগ্রিকভাবে বলা যায়, অর্থনীতির ভিত্তি দুর্বল। এ অবস্থার উত্তরণে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। এক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে বেসরকারি, সরকারি এবং বিদেশি বিনিয়োগ। এক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া উচিত। সবার আগে ব্যাংকিং খাত ঠিক করতে হবে। এছাড়াও সরকারের রাজস্ব আয় এবং রফতানি বাড়ানো জরুরি।এদিকে করোনার প্রভাব মোকাবেলায় ১ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সরকার। এর বড় অংশ ব্যবসায়ীদের ঋণ। বৃহৎ, মাঝারি শিল্পে ঋণ দেয়া হয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাড়ানো এবং গার্মেন্ট খাতে কিছুটা নগদ দেয়া হয়েছে। তবে এ ঋণ বিতরণ নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন রয়েছে। এখনও অধিকাংশ সুবিধাভোগী ঋণ পাননি।বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ যুগান্তরকে বলেন, করোনা ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও পুনর্বাসন নতুন বছরের চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, করোনার ব্যাপক সংখ্যক মানুষ চাকরি হারিয়েছেন। ক্ষুদ্র, মাঝারি খাতের অনেক উদ্যোক্তার ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে তারা চলতে পারছেন না। ফলে নতুন বছরের প্রথম কাজ হবে ছোট ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসন এবং চাকরিচ্যুতদের কর্মী পর্যায়ের লোকজনের কাজের ব্যবস্থা করা। দ্বিতীয়ত, ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫ লাখ প্রবাসী বিদেশ থেকে ফেরত এসেছেন। এরা বিদেশে ফিরতে পারছেন না। দেশেও তাদের কাজের ব্যবস্থা নেই। এক্ষেত্রে আগামী বছরে অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদার করে, তাদের কাজের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। এজন্য আমাদের ফরেন সার্ভিসকে ঢেলে সাজাতে হবে। পাশাপাশি কর্মীদেরও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা বাড়াতে হবে। অন্যদিকে কেউ কেউ করোনা দ্বিতীয় এবং তৃতীয় ঢেউয়ের কথা বলছেন। কিন্তু এটি হলে অর্থনীতি সামাল দেয়া যাবে না। তিনি বলেন, বাংলাদেশে করোনা কেন্দ্রীয় যেসব তথ্য আসছে, তা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণা। এর অনেক কিছুই বাংলাদেশের সঙ্গে মিল নেই। ফলে বাংলাদেশের আর্থ সামাজিক অবস্থার আলোকে গবেষণা জরুরি। কারণ যারা মারা গেছেন, তাদের অধিকাংশই ধনী লোক এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিধিনিষেধ মেনে চলেছেন। যেসব নিম্ন আয়ের মানুষ ওই নির্দেশনা মানেননি, তারা কিন্তু মারা যাননি। ফলে আমার কাছে মনে হচ্ছে, বাংলাদেশে দ্বিতীয় ঢেউ আসার আশঙ্কা কম।ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর সহ-সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান যুগান্তরকে, করোনার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে হোটেল-রেস্তোরাঁর অবস্থা খারাপ। অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এটি কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে। তবে করোনার ঢেউ নিয়ে যত বেশি আতঙ্ক ছিল, তত বেশি প্রভাব পড়েনি।তিনি বলেন, চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি আশার দিকও রয়েছে। কারণ ভ্যাকসিন চলে আসছে। বাংলাদেশও ভ্যাকসিন পাওয়ার জন্য ইতোমধ্যে বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করেছে। এটি আমাদের সাহস জোগায়। আর মানুষ স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারলে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, করোনায় বিনিয়োগে বেশি প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে নতুন বিনিয়োগ কমেছে। পণ্য বিপণন ব্যবস্থা ঠিক না থাকায় দেশীয় বিনিয়োগও হয়নি। তিনি বলেন, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ সামনে আসছে। ফলে আপাতত তেমন কোনো সুখবর দেখছি না। কারণ মানুষের মুভমেন্ট (স্বাভাবিক কার্যক্রম) না থাকলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল থাকে না। তবে আমরা সংস্কারের জন্য কাজ করছি। জানুয়ারির মধ্যে ৫০টি সেবা অনলাইনে পাওয়া যাবে। এতে বিশ্বব্যাংকের ডুয়িং বিজনেস রিপোর্টে (সহজে ব্যবসা করার সূচক) বাংলাদেশের অগ্রগতিসহ ব্যবসায়ীরা এর সুবিধা পাবেন। এছাড়াও আইনকানুনে বেশ সংস্কার আনা হয়েছে। আশা করছি, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বিনিয়োগে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

তথ্যসূত্র : যুগান্তর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *